নিজস্ব সংবাদদাতা, মঙ্গলকোট:- আনুমানিক চারিশত বৎসর পূর্বে বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত কাটোয়া-বর্ধমান রোডের পার্শ্ববর্তী সিদ্ধলগ্রাম (বর্তমানে শীতলগ্রাম) নিবাসী শ্রী নৃসিংহদেব মুখোপাধ্যায় একজন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর দ্বাদশ শিষ্যের একজন ধনঞ্জয় পণ্ডিত কর্তৃক শীতলগ্রামে প্রতিষ্ঠিত দেববিগ্রহ ‘শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউ’র তিনি একজন সেবাইতও ছিলেন। ইহা ব্যতিরেকে তিনি স্বগৃহে ‘শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জিউ’ ও ‘শ্রী শ্রী রাধাবল্লভ জিউ’র দেববিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করিয়া স্বহস্তে দেবসেবা ও পূজার্চনা করিতেন। নৃসিংহদেব মহাশয় এবং তাঁহার পরবর্তী কয়েক পুরুষ মধুনাথ (পঞ্চম পুরুষ) পর্যন্ত তাঁহাদের অধিকাংশই ছিলেন তাঁহাদের পিতামাতার একমাত্র পুত্র সন্তান অথবা তাঁহাদের সহোদররা নাবালক অবস্থায় পরলোক গমন করেন বা নিঃসন্তান ছিলেন। সেইকারণে তাঁহারা সকলেই দেবসেবা এবং স্বগৃহে প্রতিষ্ঠিত চতুষ্পাঠী পরিচালনা করিতে বিশেষ করিয়া অসুস্থ হইয়া পড়িলে, বিশেষ অসুবিধা উপলব্ধি করিতেন। এমতাবস্থায় মধুনাথ মহাশয় একদিন রাস্তার ধারে তাঁহার নিজের বৈঠকখানায় (গ্রামের মধ্যস্থলে) বসিয়া নিজের মনে এইরূপ অসুবিধার কথা চিন্তা করিতেছেন আর ভাবিতেছেন কিভাবে ইহার সমাধান করা যায়। শাস্ত্রে ধন, যশ ও বংশবিস্তার লাভের জন্য ও”মহামায়া”র পূজার বিধান আছে তাহা তিনি জ্ঞাত। কিন্তু গৃহে তো “বিষ্ণু” পূজা হয়, সেখানে কিভাবে শক্তির আরাধনা বা পূজা করা যাইবে। শক্তিপূজায় বলিদান আছে। গৃহে বিষ্ণু পূজা হেতু তাহা নিষিদ্ধ।

এইরূপ ভাবিতেছেন এমন সময় একজন সন্ন্যাসী রাস্তা দিয়ে যাইতে যাইতে মথুরানাথ মহাশয়কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছেন ঠাকুর মহাশয় কি ভাবিতেছেন? ‘ভাবনার কিছু নাই, ‘মহামায়া’র পূজা করুন, কোন বাধা বা অসুবিধা নাই। ‘মহামায়া’ পরম বৈষ্ণবী।’ এই কথা শোনামাত্র তিনি সবিস্ময় ফিরিয়া পাইলেন এবং বৈঠকখানার বাহিরে আসিয়া তৎক্ষণাৎ সন্ন্যাসীর খোঁজ করিয়াছিলেন কিন্তু তাঁহার আর দর্শন পান নাই। সেই বৎসরই মথুরানাথ মহাশয় স্থানীয় পটুয়াদের দ্বারা ‘দুর্গা প্রতিমা’র স্থায়ী কাঠামো/মেড় তৈয়ারী করান এবং দেবী মূর্তি নির্মাণ করাইয়া শরৎকালে যথাসময়ে শাস্ত্রবিধি অনুসারে এবং নিষ্ঠা সহকারে মহামায়ার অর্থাৎ শ্রীশ্রী দুর্গামাতার পূজা আরম্ভ করেন। সেই সময়কাল আজ হইতে দুইশত বৎসরের অধিককাল পূর্ব্বে হইবে। মথুরানাথ মহাশয়ের সময় হইতে বর্তমান পর্যন্ত ছয় পুরুষ কাল সময় অতিবাহিত হইয়াছে এবং অদ্যাবধি এই মুখোপাধ্যায় পরিবারে নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে শ্রীশ্রী দুর্গামাতার পূজা অনুষ্ঠিত হইয়া আসিতেছে। এই পূজা পল্লীগ্রামের মধ্যবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের পূজা। এখানে পূজায় বাহ্যিক জাঁকজমক এবং আলোর রোশনাই নাই। কিন্তু পূজায় পবিত্রতা ও গাম্ভীর্য বিদ্যমান। প্রতিমার কাঠামোটি স্থায়ী এবং একচাল। এখানে প্রতিমার মধ্যে মহিষ নাই। পুরান কাঠামোতেই পুনরায় নতুন মূর্তি প্রতিবৎসর তৈয়ারী করাইয়া পূজা করা হয়। বর্তমানে এই গ্রামে ৮/৯টি পরিবারে শ্রীশ্রী দুর্গামাতার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সকল পূজা উদ্যোক্তরাই সন্ধিপূজাকালে এই মুখোপাধ্যায় পরিবারে সন্ধিপূজা আরম্ভ হইলে তবেই তাঁহারা পূজা আরম্ভ করেন। সেইজন্য এই পূজামণ্ডপ হইতে সন্ধিপূজা আরম্ভ হইবার পূর্ব্বে পেঁটাঘড়ি বাজাইয়া সঙ্কেত দেওয়া হয়। সন্ধিপূজায় এই গ্রামের গ্রামদেবী ‘শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী মাতার পূজা এবং বলিদানের পর গ্রামের অন্যত্র পূজামণ্ডপে বলিদান হয়। এই মুখোপাধ্যায় পরিবারের সন্ধিপূজায় একটি কুষ্মাণ্ড (চালকুমড়ো) এবং নবমী পূজায় দুইটি কুষ্মাণ্ড (চালকুমড়ো) ও একটি শশা বলিদান হয়। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিন অন্নভোগ হয় এবং প্রসাদ বিতরণ করা হয়। প্রতিদিন পূজার পর চণ্ডীপাঠ এবং প্রতিটি পূজার পর স্তোত্রপাঠ হয়। বিজয়ার দিন বিসর্জন দেওয়া হয়।

মথুরানাথ মহাশয় তাঁহার কাঙ্খিত ফল পাইয়াছিলেন। দেবীর আরাধনার ফলে পরবর্তীকালে তাঁহার পুত্রের চারিটি পুত্র হয় এবং পরবর্তীকালে তাঁহার বংশ আরো বিস্তার লাভ করে। গ্রামবাসীগণ ও স্থানীয় লোকজন এখানে দেবীর কাছে মানৎ করিয়া পূজা দিয়া নিজেদের অভিষ্ট লাভ করিয়া থাকেন।





















