নিজস্ব সংবাদদাতা, কেতুগ্রাম :- অন্ধকার রাতে অমাবস্যার ঘন ছায়া নেমে এলে বহড়ান গ্রামের হাওয়ায় মিশে যায় এক বিশেষ উত্তেজনা। বছরের এই সময়টিতে গ্রামবাসীর প্রতীক্ষা থাকে ডাকাতকালী পুজোর। এটি কেবল এক ধর্মীয় আচার নয়, বরং বহন করে শতাধিক বছরের এক অনন্য লোকঐতিহ্য ডাকাতদের দেবীর আরাধনা। প্রথা অনুযায়ী, এই পুজো সম্পূর্ণ হয় না যদি না গ্রামবাসীরা প্রতীকীভাবে কোনো “চুরি করা” সামগ্রী মন্দিরে এনে উৎসর্গ করে। কথিত আছে, এটাই পরম্পরা গৃহস্থের বাড়ি থেকে চুরি করা বস্তুই মাকে উৎসর্গ করলে তবেই ডাকাতকালী সন্তুষ্ট হন। আজও সেই রীতি মেনে কালীপুজোর রাতে গ্রামবাসীরা বিভিন্ন সামান্য সামগ্রী মন্দিরে এনে মায়ের চরণে অর্পণ করে। এই কালীপুজোকে ঘিরে বহড়ান গ্রামের জনজীবন অন্য ছন্দ পায়। শুধু স্থানীয়রাই নয়, আশপাশের গ্রাম থেকে, এমনকি ভিন জেলা থেকেও ভক্ত ও দর্শনার্থীর ঢল নামে। আলো, ঢাক, বাজনা আর পূজার ধূপের গন্ধে মাতোয়ারা হয় গোটা গ্রাম। এই পুজোর সূত্রপাত প্রায় দেড়শ বছর আগে, গ্রামেরই এক কিংবদন্তি ডাকাত পরেশ হাজরার হাত ধরে। কথিত আছে, পরেশ ডাকাতি করতেন কেবল ধনীদের ঘরে, আর লুটের মাল ভাগ করে দিতেন গরিব মানুষের মধ্যে। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে তিনি গ্রামের উপান্তে ঘন জঙ্গলের মাঝে দেবী কালীকে ঘট পুজো দিতেন।

পরে তিনি ছোট এক মাকালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত সাধনা শুরু করেন। দেবীর কৃপায় বারবার সফল ডাকাতি করতে পারায় তাঁর কীর্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত তরুণেরা তাঁর দলে নাম লেখাতে শুরু করে, আর পরেশ হাজরা হয়ে ওঠেন এলাকার দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার। জনশ্রুতি আছে, একবার ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে বর্ধমান জেলে বন্দি করলে, কালীপুজোর রাতে দেবীর মহিমায় তিনি রহস্যজনকভাবে জেল থেকে মুক্ত হয়ে নিজের মন্দিরে পুজো দেন, এরপর আবার ভোরে জেলে ফিরে যান। সেই অলৌকিক ঘটনার পর থেকেই “ডাকাতকালী”র মাহাত্ম্য বহড়ান ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের জেলাজুড়ে। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা আজ পরেশ হাজরার বংশধরেরা আর ডাকাতি পেশার সঙ্গে জড়িত নন। তাঁদের বসতভিটে এখনও গ্রামের গর্ব। কিন্তু ডাকাতকালী মন্দিরে প্রতিদিন নিত্যপুজো হয়, আর কার্তিক অমাবস্যায় হয় জাঁকজমকপূর্ণ বার্ষিক উৎসব। গ্রামবাসীরা গর্বভরে বলেন আমাদের মা ডাকাতকালী। পরেশ হাজরার দেবী আজও আমাদের রক্ষা করেন। বহড়ানের এই ডাকাতকালী পুজো কেবল এক ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়, এটি এক জীবন্ত লোকগাথা যেখানে মিলেমিশে আছে ভক্তি, ইতিহাস, সাহস আর জনমানুষের আবেগের অদ্ভুত মেলবন্ধন।























