সৈকত ভট্টাচার্য্য, কাটোয়া:- পূর্ব বর্ধমানের আধ্যাত্মিক জনপদ কাটোয়া,চৈতন্যভূমি হিসেবে পরিচিত এই শহরের বুকে আজও শক্তির উপাসনা। গঙ্গার ঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গৌরাঙ্গপাড়া যেখানে একসময় চৈতন্যদেব কেশবভারতীর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন, তারই কাছে ক্ষ্যাপা কালিতলায় আজও ধ্বনিত হয় “জয় ক্ষেপীমা”র উচ্চারণ।
এই বৈষ্ণবভাবাপন্ন অঞ্চলে শতাব্দী কয়েক পরে জন্ম নেন নরেন ক্ষেপা, আর তাঁরই আরাধ্য দেবী “ক্ষেপীমা”। ক্ষেপা নরেন ছিলেন ভক্তিপ্রবণ এক সাধক, যিনি বৈষ্ণব ভুবনে শক্তির সাধনা শুরু করে এক নতুন ধারার জন্ম দেন। তাঁর কালী ছিলেন অন্যরকম মাতৃসুলভ, রুদ্র নয়, বরং করুণাময়ী। সেই কালীই আজ সর্বজনপ্রিয় ক্ষেপীমা।
ক্ষেপীমা—ভক্তের পরিচয়ে দেবী
যেমন ভক্তের নামে পরিচিত ফিরিঙ্গি কালী, ডাকাত কালী, বা সেরিনা কালী, তেমনি কাটোয়ার ক্ষেপীমাও ভক্তের নামেই খ্যাত।
ক্ষেপা নরেনের ভক্তি, মাতৃসাধনা এবং জনমানসের বিশ্বাস আজ ক্ষেপীমাকে করে তুলেছে দেবীভাবনার এক অনন্য প্রতীক। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস ক্ষেপীমার কাছে কিছু চাওয়া মানেই পূর্ণতা। কেউ খালি হাতে ফেরেন না।
এই অবিচল বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেই আজ ক্ষেপীমাকে সাজানো হয় সাড়ে তিন থেকে চার কেজি সোনা ও রুপোর অলঙ্কারে। মায়ের অলঙ্কার পড়ানো হয় আগের দিন রাত থেকেই, কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে। মন্দির প্রাঙ্গণে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা, থাকে পুলিশের নজরদারি।

পূজোর সূচনা- আলোর আগে মায়ের আহ্বান
ক্ষেপীমার কালীপুজো শুরু হয় ভোর চারটেয়, মঙ্গল আরতির মাধ্যমে। তখনো আকাশে অন্ধকার, কিন্তু মন্দির প্রাঙ্গণে আলোয় ভরে ওঠে চারদিক ঢাকের শব্দে, শঙ্খধ্বনিতে, ধূপের গন্ধে মিশে যায় ভক্তির ছোঁয়া। ভোরবেলায় চলে দণ্ডী কাটা, এরপর সকাল থেকেই শুরু হয় ভক্তদের ভিড়। দিনভর চলতে থাকে চণ্ডীপাঠ পূজা আরতি,ও ভোগ নিবেদন।
“২০২৫ সালের ক্ষেপীমার পুজোর নির্ঘন্ট*
🔸 ১৯ অক্টোবর (রবিবার): সকাল ন’টায় খেপি মায় চক্ষুদান।
সন্ধ্যা ৭টার পর ক্ষেপীমাকে সাজিয়ে তোলা হবে ফুল ও সোনার অলঙ্কারে। সেবায়েত ও স্থানীয় কমিটির পক্ষ থেকে ভক্তদের অনুরোধ খেপি মাকে সাজানোর অনুষ্ঠানে যেন শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
🔸 ২০ অক্টোবর (সোমবার):
মূল পুজোর দিন। ভোর ৪টেয় দেবীর বেদিমূলে সংস্থাপন, মঙ্গল আরতি ও মাতৃ আরাধনা, চণ্ডীপাঠ।
দুপুর ১২টায় নিত্যপুজো, আরতি, ভোগ নিবেদন ও পুষ্পাঞ্জলি। দুপুর ১টার পর শুরু হবে মায়ের শাঁখা পড়ানো।এ এক অনন্য আচার, যেখানে ভক্তরা মায়ের আশীর্বাদে শাঁখা পরে। সন্ধ্যা ৬টায় মায়ের সন্ধ্যারতি, সাতটার পর ঘর ভরতে যাওয়া। রাত ১০টার পর মহাপুজোর ঘটস্থাপন, বলিদান, ও ভরে প্রসাদ বিতরণে মেতে ওঠে পুরো এলাকা।
🔸 ২১ অক্টোবর (মঙ্গলবার):
ভোর থেকে শুরু হবে প্রসাদ বিতরণ, চলবে বেলা ১১টা পর্যন্ত। দুপুর ১২টায় দধিকর্মা, নিত্যপুজো ও পুষ্পাঞ্জলি। বিকেল থেকে মন খারাপের পালা শুরু হবে নিরঞ্জন ও শোভাযাত্রা ভক্তদের ঢলে ভরে যাবে গোটা মালোপাড়া। সন্ধ্যা সাতটার পর মন্দির থেকে বের হন নগর পরিক্রমা করতে। ভক্তির সমুদ্রে উৎসবের ঢেউ
ক্ষেপীমার পুজোর দিনে কাটোয়া শহর যেন থমকে দাঁড়ায়। লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয় দেশ-বিদেশ থেকে।
ভক্তরা বলেন:-
মা যেমন ক্ষেপার দেবী ছিলেন, তেমনই আমাদের মায়ের রূপে আজও বেঁচে আছেন। মা ক্ষেপী মানত করলে ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ হয় ,খালি হাতে ফেরান না।”
পুলিশি নিরাপত্তায় সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় পুজো, তবে মায়ের দর্শনের জন্য লাইন থাকে দীর্ঘ। মন্দির চত্বরে চলে ঢাকের বাদ্য, ও চিরচেনা সেই মন্ত্রোচ্চারণ
“জয় ক্ষেপীমা, জয় মা কালী!”
বৈষ্ণবভূমে শক্তির দীপ্তি
চৈতন্যের দীক্ষাস্থানের এত কাছে এক শক্তিপীঠের প্রতিষ্ঠা যেন ধর্মসাধনার এক মিলনবিন্দু যেখানে বৈষ্ণব ভাব ও শক্তিপূজার ঐক্য ঘটে। ক্ষেপা নরেনের কালী আজ কেবল এক মূর্তি নন, তিনি এক বিশ্বাস, আশ্রয় ও ভক্তির অনন্ত প্রতীক।























