রণদেব মুখোপাধ্যায়:- “আশ্বিনের রান্না কার্তিকে খায়, যে বর মাগে সে বর পায়”- গ্রামবাংলার প্রাচীন এই প্রবাদ কার্তিক আরাধনায় ব্যাপকতা এনেছে। ‘বর’ অর্থাৎ প্রার্থনা বা মনস্কামনা পূরণের জন্য কার্তিক হল একমাত্র আশ্রয়স্থল। কার্তিক হল ইচ্ছাপূরণের দেবতা, রক্ষাকর্তার দেবতা।রাজপাট থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি সন্তান -সন্ততি সহ সংসারের রক্ষাকর্তা রূপে দেবতা কার্তিক পুজো পেয়ে থাকেন। বন্ধ্যা নারীর মুখে হাসি ফোটায় কার্তিক দেবতা।ভক্তের প্রার্থনায় সাড়া দিয়েছেন বলেই দেবতা কার্তিককে বাঙালি বৌদ্ধ সমাজে দীর্ঘদিন থেকে পান্তা ভাতের ভোগ দেওয়ার রীতি আছে।বাঙালি আজও কার্তিক ঠাকুরকে পান্তা ভোগ নিবেদন করে থাকেন। কার্তিক বৈদিক দেবতা না লৌকিক দেবতা এ নিয়ে শাস্ত্রে বিভিন্ন মত আছে।তবুও সমস্ত মতভেদকে অতিক্রম করে কার্তিক কালক্রমে নিজেগুণে দেবতার আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

যুদ্ধের দেবতা হিসেবে কার্তিককে আরাধনা করার রীতি প্রথম পাওয়া যায় খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে কুষাণ যুগে। রাজা কনিষ্কের সময় রাজ মুদ্রায় দেবতা কার্তিকের প্রতিকৃতি পাওয়া যায়।কার্তিককে ধন ও সম্পদের প্রতীক হিসেবে দেখা হত। এরপর গুপ্তযুগে কার্তিকের প্রস্তর মূর্তি সন্ধান পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব সময়কালে সিংহলে বৌদ্ধ থেরবাদী সম্প্রদায়ের “কথারাগাম” মন্দিরে কার্তিক আরাধনার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।বৌদ্ধদের বিশ্বাস সন্তানের বালক অবস্থায় কার্তিক দেবতা তাদের রক্ষা করেন। অর্থাৎ বৌদ্ধদের কাছে কার্তিক ঠাকুর রক্ষার দেবতা। সেভাবেই বৌদ্ধদের মধ্যে কার্তিকের আরাধনা আজও চলে আসছে। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতের বৃহৎ অংশে কার্তিক আরাধনার প্রমাণ পাওয়া যায়। কার্তিক কোথাও সম্পদের প্রতীক আবার কোথাও রক্ষাকর্তা হিসেবে পুজো পান।খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ শতক থেকে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় রাজা-রাজরা থেকে গৃহস্থের বাড়িতে কার্তিক পুজোর প্রচলনের ইতিহাস লক্ষ্য করা যায়। কোথাও আবার কার্তিক বণিকদের রক্ষাকর্তা হিসেবে পুজো পেয়ে থাকেন।দেবসেনাপতি কার্তিক আবার সন্তানহীনা নারীদের আরাধ্য দেবতা। হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস সন্তান কামনায় নারীরা যদি কার্তিকের আরাধনা করে তাহলে সুফল পাবে। শাস্ত্রীয় মতে হিন্দুরা সন্তান কামনায় কার্তিক আরাধনা করে আর সন্তান ভূমিষ্ঠের পর ষষ্টীর পুজো করে। পুরাণমতে কার্তিকের স্ত্রী নাকি ষষ্ঠী অর্থাৎ দেবসেনা। কার্তিকের জন্ম নিয়ে যেমন বিতর্ক আছে তেমনই কার্তিকের আরাধনা নিয়েও মতভেদ আছে। শাস্ত্রীয় মতে কার্তিক গণেশ দুই ভাই হলেও শ্রেষ্ঠী সমাজে সম্পদ বৃদ্ধির জন্য গণেশের পুজো করার রীতির পাশাপাশি শ্রেষ্ঠীদের উপার্জিত সম্পদ রক্ষায় কার্তিকের পুজো করার রীতি প্রচলন আছে। দক্ষিণ ভারতের ব্যবসায়ীরা কার্তিকের পুজো করে থাকেন।

পুরাণ মতে দেব সেনাপতি কার্তিকের সঙ্গে লক্ষী-সরস্বতীর সম্পর্ক আমরা পেয়ে থাকি। বণিক সমাজে কার্তিকের সঙ্গে দেবী লক্ষীর সহাবস্থান দেখতে পাওয়া যায়। গুপ্তযুগের বণিকরা কার্তিক সংক্রান্তিতে কার্তিকের পুজো দিয়ে বাণিজ্যিক বছরের কাজ শুরু করত। হিন্দু শাস্ত্রে অগ্রহায়ন মাস হল বছরের শুরুর মাস। অগ্রহায়ণ মাসে শুভ কাজ করতে হয়। একাদশ শতকে দেশের বণিকরা কার্তিকের পুজো করে ব্যবসা শুরু করত এরকম নজির পাওয়া যায়। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ কার্তিক মাসকে বিশেষভাবে ধর্মীয় মাস হিসেবে পালন করে থাকে। শাস্ত্রীয় মতে কার্তিক বৈদিক দেবতা না হয়েও দেবতাদের সেনাপতি হিসেবে পুজো পায়। যদিও দেবসেনাপতি কার্তিককে শাস্ত্রজ্ঞরা লোকদেবতা বলে থাকেন।

কাটোয়ায় কার্তিক পুজো কার হাত ধরে কীভাবে শুরু হয়েছিল সে বিষয়ে নানান মত পাওয়া যায়। তবে জনশ্রুতি আছে বাণিজ্য নগরী কাটোয়ায় বারবণিতাদের হাত ধরে কার্তিক পুজোর ব্যাপকতা পেয়েছিল। যদিও এই জনশ্রুতির স্বপক্ষে তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। উল্টে এটা বলা যায়, চৈতন্যমহাপ্রভুর অপ্রকটের পর ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রভু নিত্যানন্দের তনয় বীরভদ্র কাটোয়ার বৈষ্ণবপাড়ায় গেরস্তের বাড়িতে কার্তিক আরাধনা করেছিলেন বলে বৈষ্ণব পণ্ডিতদের টীকায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সেইসময় কাটোয়ার নদীতীরবর্তী বৈষ্ণবপাড়ার পাশাপাশি আচার্যপাড়া, ব্রাহ্মণপাড়ার টোলবাড়ি সহ বেশ কিছু এলাকায় বাড়ি বাড়ি কার্তিকের ছোট ছোট মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো করা হত। ইতিহাস বলছে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি থেকে কাটোয়ায় গেরস্তের বাড়িতে কার্তিকের মূর্তি পুজোর প্রচলন ছিল। যদি বিশ্বাস করি যে কাটোয়ায় কার্তিক আরাধনার বারবণিতাদের হাতধরে শুরু হয়েছিল তাহলে এ প্রশ্ন থেকে যায় যে নদীতীরবর্তী পূর্বস্থলী, বাঁশবেড়িয়া, চুঁচুড়া, বাঁকুড়ার সোনামুখী সহ মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গায় শতাব্দী প্রাচীন কার্তিক আরাধনা কাদের হাত ধরে পত্তন হয়েছিল।সেখানে তো কোন বারবণিতার গল্প পাওয়া যায়না। অথচ নদীতীরবর্তী উল্লেখিত জনপদে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে কার্তিক উৎসব উদযাপন করা হয়। কাটোয়ায় কার্তিক আরাধনা যে প্রাচীনকাল থেকে হয়ে আসছে তার আরও একটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে ভারতে কার্তিক পুজোর শুরু হয়েছিল গঙ্গারিডি সভ্যতার যোদ্ধাদের হাত ধরে। ভাগীরথীর নিম্ন অববাহিকাকে গঙ্গা বলা হয়। গঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে যে আধুনিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তাকে গঙ্গারিডি সভ্যতা বলা হত।গঙ্গারিডি সভ্যতায় রাজ রাজড়াদের রক্ষা করতে অন্ত্যজ শ্রেনীর যুবকদের যোদ্ধা হিসেবে নিয়োগ করা হত। এদের কাজ ছিল লাঠি,বর্শা নিয়ে হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধ করা।গঙ্গারিডি রাজার আরাধ্য দেবতা ছিলেন দেবসেনাপতি কার্তিক। গঙ্গারিডি যোদ্ধারা প্রথম যুদ্ধের দেবতা দেবসেনাপতি কার্তিকের আরাধনা কাটোয়ায় শুরু করেছিল। কন্টকনগর বা কাটোয়া ছিল গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের প্রবেশদ্বার সেহেতু ইতিহাসবিদদের অনুমান কাটোয়া নগরে কার্তিকের আরাধনা এই গঙ্গারিডি সভ্যতার যোদ্ধাদের হাত ধরে শুরু হয়েছিল। ভাগীরথী নদীতীরবর্তী অন্যান্য নগরে কার্তিকের আরাধনার নজির কিন্তু ইতিহাসবিদদের পক্ষে যায়। এছাড়াও খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতক গুপ্তযুগে কাটোয়া নগরে কার্তিক আরাধনার নজির পাওয়া যায়।তাহলে কাটোয়ায় বারবণিতাদের হাত ধরে কার্তিক পুজোর ব্যাপকতা বা বিস্তৃতি লাভ করেছে এই তথ্যে কতটা সঠিক সেবিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এছাড়াও কাটোয়া নগর ছিল গুপ্ত সম্রাটদের শাসনাধীন এলাকা।সময়ের গ্রাসে পড়ে সভ্যতার সঙ্গে জাতিও লুপ্ত হয়েছে তাদের আরধ্য দেবতার বিলুপ্ত হয়েছে। যদিও একথা বলা যেতেই পারে বণিকদের কার্তিক পুজো উৎসব উদযাপনে বারবণিতাদের পরোক্ষ যোগ থাকতে পারে। উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে নদীতীরবর্তী কাটোয়া শহরে ব্যবসা বাণিজ্যের সমৃদ্ধির জন্যই শ্রেষ্ঠীদের হাত ধরে কার্তিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে একথা অনস্বীকার্য। নবাবি শাসনকাল থেকেই ‘কাটোয়া বন্দর’ পূর্ব ভারতের অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল।অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কাটোয়ায় বাণিজ্য শুরু করেছিল। কাটোয়ার বন্দরের ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ মদতে কাটোয়ায় কার্তিক সর্বজনীন রূপ পেয়েছিল।
ইতিহাসের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অতীতের আলোতে বর্তমানকে পথ দেখানো,সমাজ ও গোষ্ঠীর চলাফেরা পথ ও বিপথ দেখিয়ে মানুষকে সাবধান করা। ইতিহাস কাহিনিকার নয়, ইতিহাস উপদেষ্টা। মানুষের চরিত্রে নিগুঢ় তত্ত্বদর্শীদের নীতিসূত্রের ভাষ্য হচ্ছে ইতিহাস। ইতিহাসবেত্তা গৌতম ভদ্রের এই কথাকে সামনে রেখে বলতেই হয় কাটোয়ার “কার্তিক লড়াই” কথাটার মধ্যে একটা দ্যোতনা আছে। হিন্দুদের থাকবন্দি সমাজে কার্তিককে আমরা সন্তানহীনা দম্পতির উদ্ধারকর্তা রূপে পেয়েছি। আবার সেই কার্তিক দেবসেনাপতি হয়ে দক্ষিণভারত থেকে এমনকি ভিনদেশ সিংহলে রক্ষাকর্তা রূপে পেলাম। বাঙালি বৌদ্ধরা নিজেদের খাদ্য সঙ্কট কাটাতে পান্তাভাত দিয়ে কার্তিকের পুজো করে থাকে।কাত্যায়নীর সন্তানকে নিজেদের রক্ষাকর্তা দেবতা ভেবে বৈষ্ণবরা কার্তিক আরাধনা করে থাকে।কার্তিক আরাধনায় লক্ষী লাভ হয়। খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে শুঙ্গযুগে রাজা কনিষ্ক কার্তিক আরাধনায় লক্ষী লাভ করেছিলেন বলেই তার রাজত্বে মুদ্রায় কার্তিকের প্রতিকৃতি রেখেছিলেন। রাজা কনিষ্ক রাজ সমৃদ্ধিকে ধরে রাখতে কার্তিক আরাধনার প্রচলন করেছিলেন।
দেশের অধিকাংশ উৎসবের উৎপত্তির সঙ্গে কোনো না কোনো ধর্মের কাহিনি জুড়ে থাকে ।কাটোয়ার কার্তিক উৎসব তার ব্যতিক্রম হয় নি। কাটোয়ায় কার্তিকের উৎসব যা স্থানীয়ভাবে ‘কার্তিক লড়াই’ নামে পরিচিত তার প্রচলন হয় উনবিংশ শতকের শেষ দিকে প্রধানত ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায়। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে সুকৌশলে কাটোয়ার উঠতি শ্রেষ্ঠী সমাজ এই উৎসবকে সুকৌশলে সমাজে পত্তন করেছিল।প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যবসায় পড়ে থাকা বকেয়া অর্থনীতিকে উদ্ধার করা। শুরুতে এই কার্তিক উৎসবকে সামনে রেখে ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব নিষ্পত্তি করা হত।দেশের অর্থনীতির বড় বৈশিষ্ট্য হলো গ্রামীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণ। উৎসবগুলি একটি দেশের সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে। একটি উৎসব বা মেলা স্থানীয়ভাবে এলাকার বা বৃহত্তরভাবে দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, এবং মূল্যবোধের বিভিন্ন দিক উন্মোচন করে। এলাকার মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে এবং জনগণের মধ্যে সম্প্রদায়ের বোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে উৎসব । লোকজ উৎসব স্থানীয়ভাবে শহরের সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ:কাটোয়ার কার্তিক লড়াই যা কাটোয়ার একেবারে নিজস্ব উৎসবে পরিনত হয়েছে তার ঐতিহ্যগত আচার-অনুষ্ঠান,পরিবেশনা কর্মকাণ্ড পরম্পরাগতভাবে প্রজন্মের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রাচীন কাটোয়ার সাংস্কৃতিক চর্চা, রীতিনীতির ধারাবাহিকতাকে নিশ্চিত করে বর্তমান প্রজন্মের কাছে সাংস্কৃতিক জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রেরণে সাহায্য করে।কার্তিক লড়াইয়কে ঘিরে যে মেলা বসে তাতে বিভিন্ন দেশজ পণ্যর কেনাবেচা হত। শুরুতে অধিকাংশ পণ্যই ছিল এলাকার কুটিরশিল্প জাত পণ্য। যার ফলে উৎসব পরিসরে যত বড় হয়েছে কাটোয়ার কার্তিক লড়াইকে ঘিরে আমাদের এলাকার অর্থনীতিও ততটাই শক্তিশালী হয়েছে।ব্যবসার পরিসর বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থশাস্ত্রের কথা অনুসারে বিভিন্ন গ্রামীণ বা শহুরে মেলায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য যত বেশি বিক্রি হয় গ্রামীণ অর্থনীতি ততই বৃদ্ধি পায়।বিংশ শতকের শুরুর দশক থেকে কাটোয়ার কার্তিক লড়াইকে ঘিরে শহরের বিভিন্ন স্থানে যে মেলা বসত তাতে অধিকাংশ আঞ্চলিক কুটির শিল্প,মাটির
তৈজসপত্র,কাঁসা-পিতলের বাসন, বহুমূল্যবান তরস,মসলিনের কাপড়, দেশীয় কাপড়, দেশীয় খাবার, হস্ত শিল্পজাত গয়নাগাটি, নানান আকৃতির হাতে তৈরি ফুল, মশলার দোকান সহ মিষ্টি জাতীয় খাবারের একটি বড় বাজার তৈরি হত। কার্তিক লড়াইয়ে কাটোয়ার নদী তীরবর্তী হরিসভা পাড়া ও ঠাকুরপুকুর পাড় এলাকায় রীতিমত মেলা বসত। মিষ্টির দোকান, খাবারের দোকান, কুটির শিল্পের সমাহার যেমন মাটির তৈজসপত্র, কাঠের ও লোহার তৈরি নানান সরঞ্জাম মেলায় বিক্রি করতে পার্শ্ববর্তী নদীয়া ও বীরভূম জেলা থেকে ব্যাপারীরা আসত। কাটোয়া মহকুমা হল কৃষিজ সম্পদে পরিপূর্ণ একটি সমৃদ্ধ এলাকা। পাশাপাশি কাঁসা-পিতল ও বয়নশিল্পের প্রসিদ্ধ জায়গা। অগ্রহায়ণ মাসে শুরুতে গ্রামগঞ্জে নবান্ন উৎসবের আয়োজন হয়। গ্রামীণ এলাকার মানুষ উৎসব উদযাপনের জন্য গ্রাম ছেড়ে শহর মুখো হত।রাত জেগে উৎসবকে পালন করে শহরে কেনা-কাটা করে মানুষ গ্রামে ফিরত। এতে পর্যটনের সম্ভাবনা ও অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি পেত। বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন,অর্থনীতির যোগসূত্র ছাড়া কোনো উৎসবই দীর্ঘদিন চলতে পারে না।
কাটোয়ার কার্তিক লড়াইকে কেন্দ্র করে মেলায় বাঁশ, বেত, কাঠের তৈরি জিনিস, মাটির তৈজসপত্র, খেলনা, তালপাতার খেলনা, বিভিন্ন ধরনের মুড়ি- মুড়কি, নাড়ু বাজারেই বিক্রি হত। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের কাটোয়ার বাজারের ‘ইশ্বরবৃত্তির হিসেবের খাতা’র নথি অনুসারে তিনটি পৃথক জায়গায় ৮৪ জন ব্যবসায়ী তৎকালীন সময়ে দৈনিক তিন -চার হাজার টাকার সামগ্রী খুচরো বিক্রি করেছে। এর বাইরে স্টিমার ঘাট লাগোয়া কুলি পট্টিতে আরো প্রায় দশ হাজার টাকার শাড়ি,কাপড় বিক্রি হয়েছে। ঈশ্বরবৃত্তির খাতায় যে অঙ্ক লিপিবদ্ধ করা হয়নি। আর একটি মহার্ঘ্যবস্তু লিপিবদ্ধ হয়নি যা হল “দেশীয় মদ”। সুরা রসিকদের কাছে যার পরিচয় ছিল ‘কান্ট্রি স্পিরিট’ নামে। ১৯২০-২৪ খ্রিস্টাব্দে কাটোয়ায় সরকার অনুমোদিত কোন মদ বিক্রির দোকান বা কাউন্টার না থাকায় শহরের সুরা প্রেমিক মানুষজন সাহেব বাগান এলাকার পুকুরপাড়ের পচুই মদের দোকানে ভিড় জমাত।ওখানেই কিছু অসৎ ব্যবসায়ী চোলাই মদ গোপনে বিক্রি করত। উৎসব উপলক্ষ্যে গুড়-বাখর সহযোগে মদ তৈরি করা হত। কিন্তু মজার বিষয় কার্তিক লড়াইয়ের সময় কলকাতার বন্দর থেকে গোপনে চোরাপথে কাপড়ে মুড়িয়ে বস্তা বস্তা কান্ট্রি স্পিরিটের বোতল কাটোয়া বন্দরে ধোবা গোডাউন বা পশারিপট্টির খোট্টাদের গোডাউনে মজুত করা হত। কাটোয়ার স্টিমারঘাট এলাকায় সুভাষ দাসের মনোহারি দোকান এবং ঠাকুরপুকুর পাড় এলাকার চিন্তা দাসের মনোহারি দোকানে মদ পাওয়া যেত। আলকাতরা মাখানো শোলার ছিপি দিয়ে কাঁচের বোতলের মুখ আঁটা থাকত। ফাঁকা কাঁচের বোতল ফেরত দিলে বোতল পিছু আধ পয়সা পাওয়া যেত। বারোটি ছয়শ মিলির খালি কাঁচের বোতল ফেরত দিলে এক আনা পাওয়া যেত। সুভাষ দাস মনোহারি দোকান থেকে কান্ট্রি স্পিরিট বিক্রির দায়ে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। আর্থিক জরিমানা সহ মুচলেখা দিয়ে মুক্তি মিলেছিল। কিন্তু সুভাষ দাস কান্ট্রি স্পিরিট বিক্রি বন্ধ করেনি। কারণ ব্রিটিশ পুলিশ নিজেই ছিল তার খদ্দের। কার্তিক লড়াইকে ঘিরে কয়েক হাজার টাকার মদ বিক্রির নজির আছে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কাটোয়া থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত দারোগা গোষ্ঠ দত্ত তৎকালীন কাটোয়ার মহকুমা শাসক রতন লাল দে মহাশয়ের মাধ্যমে বর্ধমান জেলা কালেক্টর সাহেবকে কান্ট্রি স্পিরিটের কাউন্টার খোলার জন্য পত্র মারফত আবেদন করেছিলেন।থানার দারোগা লিখেছিলেন,কাটোয়া বন্দর এলাকার ব্যবসাদার সহ সাধারণ মানুষের জন্য অবিলম্বে কান্ট্রি স্পিরিটের অনুমোদিত কাউন্টার করার ব্যবস্থা করা হোক। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে কার্তিক পুজোর প্রাক্কালে অননুমোদিত কান্ট্রি স্পিরিট বিক্রির অভিযোগে স্টিমার ঘাট এলাকা থেকে তিন ব্যক্তি এবং পসারি পট্টির খোট্টাদের গোডাউন থেকে চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দু:খের বিষয় ভেটেরা পাড়ার গলিতে থাকা তৎকালীন সরকারি জেলে জায়গার অভাবে মদ বিক্রেতা সহ মজুতদারদের পুলিশকে নামমাত্র মামলা দিয়ে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। একই বছরে কাটোয়া সুভাষ সাহার মনোহারি দোকানে প্রায় দেড় হাজার খালি কান্ট্রি স্পিরিটের বোতল উদ্ধার হয়েছিল। এর থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার কার্তিক লড়াইয়ে মদ বিক্রির কর বাবদ সরকার ভালো টাকা আয় হত।একইভাবে মিষ্টির দোকান গুলোয় বিক্রি হত কয়েক হাজার টাকার মিষ্টি। রুট,পরোটা সহ মাংসের সঙ্গে বেশি বিক্রি হত তাঁতের কাপড়। বহিরাগত ব্যবসায়ীরা মোকাম থেকে মসলিন,তসরের হাজার হাজার টাকার বহুমূল্যের তাঁত কাপড় কিনত। কাটোয়ায় উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রতিবছর কাটোয়ায় বৃদ্ধি পেতে থাকল।১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর মি.উইলিয়াম বেনসন হেকক কৃষিজাত ও কুটিরশিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদন ও বিক্রির উপর জেলা জুড়ে সার্ভে করিয়েছিলেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে সার্ভের প্রাপ্ত রিপোর্ট অনুসারে কাটোয়ায় সবচেয়ে বেশি কুটিরশিল্প জাত দ্রব্যের উৎপাদন বেশি হয়েছিল এবং অক্টোবর- নভেম্বর মাসে বিক্রি হয়েছিল বেশি। কারণ খুঁজতে গিয়ে জেলা প্রশাসন জানতে পারে কাটোয়ার কার্তিক লড়াইকে ঘিরে অস্থায়ী হাটে প্রায় দৈনিক ২১ হাজার টাকার উপর মসলিনের কাপড় সহ তাঁত কাপড় বিক্রির হয়েছিল। কাটোয়ার মুস্থুলি, আমডাঙ্গা, জগদানন্দপুর, চাণ্ডুলি,বনকাপাসি গ্রামের তন্তুবায় শ্রেনীদের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর তলব করেছিলেন। কাটোয়ার কার্তিক উৎসবকে ঘিরে যে মেলা বসে তা যে বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছিল এই সার্ভে রিপোর্ট একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
একটা উৎসবকে কেন্দ্র করে এলাকার কুটির শিল্পের চাহিদা এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের আরোপিত কুটিরশিল্পনীতিতে প্রভাব ফেলেছিল। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের জেসিকে পিটারসনের বর্ধমান জেলা গেজেটিয়ারে উল্লেখ করা হয়েছে কাটোয়া এলাকার উৎপাদিত কুটিরশিল্প বিশেষ করে বয়নশিল্প ও কাঁসা-পিতল শিল্প রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারির নির্দেশ। ব্রিটিশ সরকার ভ্রান্ত নীতিতে কুটির শিল্প ধ্বংস হতে বসেছিল। কিন্তু ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে টানা এক দশক ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কার্তিক উৎসবকে ঘিরে বয়ন শিল্প ও কাঁসা-পিতলের শিল্পের উৎপাদিত শিল্পকর্ম যেভাবে ব্যবসাদাররা ভিন রাজ্যে রপ্তানি করে মুনাফা করেছে তাতে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে জেলা প্রশাসন কাটোয়ার বন্দর থেকে বয়নশিল্প, কাঁসা-পিতল শিল্পের উৎপাদিত শিল্পকর্ম রপ্তানির নীতি বদল ঘটয়েছিল। এত রপ্তানি সম্ভব হয়েছিল কার্তিক উৎসবকে ঘিরে।এই রাজ্য সহ ভিনরাজ্যের ব্যবসাদাররা কাটোয়ার মোকাম থেকে লাখ-লাখ টাকার মসলিন শাড়ি,উন্নত তাঁতকাপড় কিনে নিয়ে যেত। কাটোয়া মহকুমার বাগটিকরা, ঘোড়ানাশ, মুস্থুলি,সিঙ্গি শ্রীবাটি, গোপখাঁজি, চাণ্ডুলি গ্রামের তন্তুবায়দের প্রয়োজনীয় রেশম গুটি উড়িষ্যার চাঁইবাসা,ময়ুরভঞ্জ,বহরাগোরা থেকে আমদানি করতে ব্রিটিশ সরকার প্রত্যক্ষ সাহায্য করেছিল। অর্থনৈতিক ভাবে এলাকা আরও শক্তিশালী হয়েছিল। কাটোয়ার প্রতিষ্ঠিত বস্ত্রব্যবসায়ীরা সে সময় অনেকেই কলকাতায় শাড়ি-কাপড়ের পাইকারি ব্যবসার জন্য মোকাম করেছিল। কার্তিক পুজোর বারবাড়ন্তের সঙ্গে কাটোয়ার ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘বাবু’ সম্প্রদায়ের বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হল।বহিরাগত নব্যশ্রেষ্ঠীরা সে সময় নিজেদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ নামের পাশে বাবু তকমা জুড়তে কার্তিক পুজোর পৃষ্ঠপোষক হয়ে যেত। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি বহিরাগত কিছু অবাঙালি শ্রেষ্ঠী ব্যবসার করতে কাটোয়া এসেছিলেন। যেমন জীবনরাম গোয়াঙ্কা, বক্সীরাম খাণ্ডেলওয়াল, গজানন বাজোরিয়া,জানকীলাল খাণ্ডেলওয়াল, বাবুলাল গোয়েঙ্কা, শুভরাম প্যাটেল এরা সকলে কাটোয়ায় থিতু হয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল। এই ব্যবসায়ী পরিবারগুলি প্রায় প্রত্যেকে সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেতে নিজ অর্থ ব্যয় করে এলাকায় একটি করে কার্তিক পুজোর পত্তন করেন।বিহারের বাসিন্দা প্রখ্যাত তামাক ব্যবসায়ী ভগবান খোট্টা কাটোয়ার বন্দর থেকে তামাক সরবরাহ করে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। ব্যবসায়ী সমাজের সিদ্ধান্তে কার্তিক পুজোয় ভগবান খোট্টার প্রশাসন সামলানোর দায়িত্ব ছিল। এদের সঙ্গে যোগ হয়েছিল পার্শ্ববর্তী নদীয়া জেলার ব্যবসায়ী এবং বর্ধমান জেলার গ্রামাঞ্চল থেকে আসা কয়েকজন বিত্তবান পরিবার। কাটোয়া বন্দর থেকে লবন,কয়লা,কেরসিন,মশলা বস্ত্র কাঁসা-পিতলের বাসন সরবরাহ করা হত। এই ব্যবসাসূত্রে কাটোয়ায় অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে উনবিংশ শতকের শুরু পর্যন্ত কাটোয়ায় এসেছিলেন চন্দ্র, দত্ত, দাস,রায়, মুহুরি, সাহা,দাঁ,গুঁই, দে, খাঁ ও নন্দী পরিবার। এই পরিবারগুলি প্রত্যকেই ব্যবসায়িকভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এদের মধ্যে কারও কারও কলকাতায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল।১৭৯০ খ্রিস্টাব্দ কাটোয়া তখন গঞ্জ মুর্শিদপুর নামে পরিচিত। এই ব্যবসায়ী গোপীবল্লভ খাঁয়ের প্রজন্ম বিশিষ্ট বস্ত্র ব্যবসায়ী তারাপদ খাঁয়ের হাত ধরে কিন্তু কাটোয়ার কার্তিক পুজো সর্বজনীন হয়। তারাপদ খাঁ তাঁতিপাড়ায় তার বসর বাড়ির কাছে সাতভাই কার্তিক পুজো পত্তন করেন। পরিবারের মধ্যে দু একজন পত্তনিদার ছিলেন। প্রাক স্বাধীনতা যুগে অর্থাৎ বিংশ শতকের শুরু দিকে কাটোয়ায় ব্যবসায়ী হিসেবে দেবনাথ, বণিক, গড়াই পাঁজা,কোনার পরিবার এসেছিলেন। প্রধানত ব্যবসায়ীরা কার্তিক পুজোকে একটা ব্যবসার লক্ষ্য বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরে সারাবছর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চালাত।
কাটোয়া বা তার পার্শ্ববর্তী জেলার এমন কিছু শিল্পী ছিল যারা কাটোয়ার কার্তিক লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়ে গিয়েছে। পুজো উদ্যোক্তারা ফিবছর তাদের পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দিত।এইসব মানুষগুলো ছিল উৎসবের অন্যতম কারিগর বলা চলে স্থপতি। যেমন অগ্রদ্বীপের আশু পাল,কাটোয়ার চারুচন্দ্র পাল,নদীয়া জেলার মাটিয়ারির গণেশ পাল এরা সকলে ছিলেন মৃৎশিল্পী। পুরাণ কাহিনি অনুসারে দেব-দেবীর নানান মূর্তি তৈরি করত। এদের শিল্পকর্ম এলাকার মানুষের কাছে ছিল গর্বের৷ কার্তিকের থাকায় বৈদিক দেব-দেবীকে নানান রঙিন পোশাক পরিয়ে সাজিয়ে তুলতেন ব্রজ মহান্ত,ধর্মদাস মহান্ত। দুজনেই ছিলেন কাটোয়ার বাসিন্দা। কার্তিক সহ দেব-দেবীদের পোশাক ভাড়া দিতেন মতি সেখ নামে এক ড্রেস কোম্পানির কর্তা।জার্তিকের নান্দনিক যেসব থাকা হত তাকে সাজিয়ে তুলত এই মহান্তরা।শোভাযাত্রায় ডে-লাইট, গ্যাস লাইট, হ্যাজাক ভাড়া দিতেন বৃন্দাবন দাস, সুধীর দাস। কার্তিক পুজোর মরসুমে বাইরের জেলা থেকে বেশি টাকা ভাড়া দিয়ে সুবীর দাস শোভাযাত্রার ডে-লাইট এনে কাটোয়ায় পুজো কমিটিকে সরবরাহ করতেন। শোভাযাত্রায় বেহারা ভাড়া কিরে আনা হত মুর্শিদাবাদের জলসুতি, নদীয়ার জুড়ানপুর, বনকাপাসি, গাঁফুলিয়া, অগ্রদ্বীপ এলাকা থেকে। মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর, বহরমপুর থেকে আনা হত ব্যাণ্ডপার্টির দল। গঙ্গাপারের আকন্দবেড়িয়া, আসাচিয়া, কালীগঞ্জ, কাটোয়ার গঙ্গাটিকুরি, কেতুগ্রাম,রামজীনপুর-কান্দরা থেকে বাঁশি সহ ‘ডগর-কাড়া’ ভাড়া করা হত। যাদের একটু বেশি টাকা বরাদ্দ থাকত তারা ব্যাণ্ডপার্টি বায়না করত। কাটোয়ার কার্তিক উৎসবকে আমরা যে কাটোয়ার কার্তিক লড়াই নামে চিনি তার মুল কারিগর হল কিন্তু এই বেহারার দল এবং বাজনার দল।এরাই বাবুদের “কার্তিকের থাকা” কাঁধে করে স্বল্পপরিসর রাস্তায় ছুটবে। কোন বাবুর থাকা আগে যেতে পারে সেটার জন্য দৈহিক শক্তি প্রয়োজন পড়ত। এইসব বেহারাদের জন্য পচুই,চোলাই সহ কান্ট্রি স্পিরিট বরাদ্দ থাকত।
স্বাধীনতার পর বঙ্কিম বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক ব্যবসায়ী হ্যাজাক,ডে-লাইট এর সঙ্গে ঝাড়বাতি সরবরাহ করতেন। এই সব শিল্পের সঙ্গে জড়িত পেশাদারী মানুষগুলো কার্তিক লড়াইয়ে বাড়তি কিছু আয় করত। ব্যবসায় নতুনত্ব আনতে ফি-বছর কার্তিক পুজোর জন্য নতুন নতুন উপকরণ সহ সাজ সরঞ্জাম আমদানি করত। কার্তিকে লক্ষী লাভ করলেও এদের উৎসবের প্রতি মমত্ববোধ ছিল। কাটোয়ার গৌরাঙ্গের সেবা চালাতে ও কংক্রিটের গৌরমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বৈষ্ণব মহাজন বীরভদ্র এবং জাহ্নবা দেবীর প্রস্তাবে কাটোয়ার তৎকালীন ব্যবসাদাররা এগিয়ে এসেছিলেন। প্রতিটি ব্যবসাদার দিনান্তে হাটের ইজারাদারের কাছে এক পয়সা করে ঈশ্বরবৃত্তি তুলে দেবেন। ঈশ্বরবৃত্তির অর্থে বছরভর গৌরমন্দিরের সেবাকার্য চলত। মন্দির নির্মাণ কাজের জন্য বাড়তি অর্থ জমা রাখা হত। এই কাজ মহান্তরা করতেন। কাটোয়ার কার্তিক পুজোর খরচ চালাতে সেই শতাব্দীপ্রাচীন ঈশ্বরবৃত্তি প্রথা ব্যবসায়ীরা কাটোয়ায় আবার প্রচলন করেছিলেন। ষষ্ঠী রজক সুবল রজক নামে দুই ব্যক্তি বছর ভর কাটোয়ার হাটে ঈশ্বরবৃত্তি তুলত। পাইকারি হাট থেকে এবং খুচরো বিক্রেতাদের কাছ থেকে ঈশ্বরবৃত্তির টাকা দুরকম অঙ্কে নেওয়া হত। অর্জিত ঈশ্বরবৃত্তির টাকায় কাটোয়ার হাটে ( বিংশ শতকের পঞ্চাশ দশকের পর বাজার হয়েছিল) কার্তিকের পুজো হত। মচ্ছব করা হত শুধু না বছরভর বাজারে অন্যান্য পুজোও করা হত ঈশ্বরবৃত্তির টাকা থেকে। কার্তিক পুজোর সঙ্গে সরাসরি অর্থ জড়িত ছিল এই হাটে আর ছিল স্টিমার ঘাট লাগোয়া গুদামঘর গুলিতে। শিল্পকলা এবং সৃজনশীলতার প্রচার কাটোয়ার কার্তিক উৎসবে শৈল্পিক পরিবেশনা, কারুশিল্প প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক প্রদর্শন বোদ্ধাদের নজির কেড়েছিল। ভক্তিবাদের শহর কাটোয়ায় গৃহস্থের কার্তিক যখন ব্যাপারীদের হাত ধরে সর্বজনীন রূপ পেল তখন প্রতিমার চেহারার পরিবর্তন হল। কার্তিক মূর্তিকে ঘিরে থরে থরে সাজানো থাকে পুরাণ কাহিনি আশ্রিত নানান দেব-দেবীর প্রতিমা। এটিকে ‘থাকা’বলা হয়।কাটোয়া থাকা প্রচলন হয়েছিল আনুমানিক ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে।কাটোয়ার কার্তিকের ‘থাকা’ শিল্পশৈলী বাংলার অনন্য দৃষ্টান্ত। মৃৎশিল্পী এবং কলাকুশলীরা তাদের প্রতিভা প্রদর্শনের জন্য একটি বিশাল প্ল্যাটফর্ম বা পরিসর পায়। আঞ্চলিক শিল্প ও সৃজনশীলতার বিকাশকে দিন দিন উৎসাহিত করেছে কাটোয়ার মৃৎশিল্পীদের নান্দনিক সৃজন। একটি থাকায় কম করে ১৬-২৪ টি মাটির পুতুল লাগত, বাঁশ যোগে থাকা তৌরি করার ভিন্ন শিল্পী ছিল।মাটির মূর্তিকে নানান রাজকীয় পোশাক পরিয়ে সাজিয়ে তোলার জন্য ছিল ড্রেস কোম্পানি। কার্তিক উৎসব মিটে গেলে পোশাক খুলে নেওয়া হত। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের এক উদ্যোক্তাদের হিসেব অনুসারে পোশাক ভাড়া, মাটির পুতুলকে দেব-দেবীর সাজে সাজানো বাবদ থাকা পিছু ২৫০-৩০০ টাকা পারিশ্রমিক নেওয়া হত। যারা মূর্তি তৈরি করত সেসব মৃৎশিল্পীরা মূর্তি পিছু ৬০-৮০ টাকা পারিশ্রমিক নিত। এছাড়া বাঁশ-রশি যোগে যারা থাকার অবকাঠামো তৈরি করত তাদের পারিশ্রমিক ছিল থাকা পিছু ৬০০-৭০০ টাকা। সে সময় তেমন দৃষ্টিনন্দন প্যাণ্ডেল হত না। যারা কার্তিকের থাকার অবকাঠামো তৈরি করত তারাই প্যাণ্ডেল করে দিত।
কাটোয়া বা পার্শ্ববর্তী জেলার এমন কিছু শিল্পী ছিল যারা কাটোয়ার কার্তিক লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়ে গিয়েছে। পুজো উদ্যোক্তারা ফিবছর তাদের পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দিত।এইসব মানুষগুলো ছিল উৎসবের অন্যতম কারিগর বলা চলে স্থপতি। যেমন অগ্রদ্বীপের আশু পাল,কাটোয়ার চারুচন্দ্র পাল, নদীয়া জেলার মাটিয়ারির গণেশ পাল এরা সকলে ছিলেন মৃৎশিল্পী। পুরাণ কাহিনি অনুসারে দেব-দেবীর নানান মূর্তি তৈরি করত। এদের শিল্পকর্ম এলাকার মানুষের কাছে ছিল গর্বের৷ নজরকাড়া শিল্প নিদর্শনের জন্য এরা বিখ্যাত হয়েছিলেন। কার্তিকের ‘থাকায়’ বৈদিক দেব-দেবীকে নানান রঙিন পোশাক পরিয়ে সাজিয়ে তুলতেন ব্রজ মহান্ত,ধর্মদাস মহান্ত সহ কিছু পেশাদার শিল্পী। দুজনেই ছিলেন কাটোয়ার বাসিন্দা। কার্তিক সহ দেব-দেবীদের পোশাক ভাড়া দিতেন ঠাকুর পুকুর পাড়ের মতি সেখ নামে এক ড্রেস কোম্পানির কর্তা।কার্তিকের নান্দনিক যেসব থাকা হত তাকে সাজিয়ে তুলত এই মহান্তরা।শোভাযাত্রায় ডে-লাইট, গ্যাস লাইট, হ্যাজাক ভাড়া দিতেন নিচু বাজারের বৃন্দাবন দাস, সুধীর দাস। প্রয়োজনে কার্তিক পুজোর মরসুমে বাইরের জেলা থেকে বেশি টাকা ভাড়া দিয়ে সুবীর দাস শোভাযাত্রার ডে-লাইট এনে কাটোয়ায় পুজো কমিটিকে সরবরাহ করতেন। শোভাযাত্রায় বেহারা ভাড়া করে আনা হত মুর্শিদাবাদের জলসুতি,বালুটিয়া, বহরান, নদীয়ার জুড়ানপুর, বনকাপাসি, গাঁফুলিয়া,অগ্রদ্বীপ এলাকা থেকে। মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর, বহরমপুর থেকে আনা হত ব্যাণ্ডপার্টির দল। গঙ্গাপারের আকন্দবেড়িয়া, আসাচিয়া, কালীগঞ্জ, কাটোয়ার গঙ্গাটিকুরি, কেতুগ্রাম,রামজীবনপুর-কান্দরা থেকে বাঁশি সহ ‘ডগর-কাড়া’ ঢোল ভাড়া করা হত। যাদের পুজোয় একটু বেশি টাকা বরাদ্দ থাকত তারা ব্যাণ্ডপার্টি বায়না করত। কাটোয়ার কার্তিক উৎসবকে আমরা যে কাটোয়ার কার্তিক লড়াই নামে চিনি তার প্রধান কারিগর হল কিন্তু এই বেহারার দল এবং বাজনার দল।এরাই বাবুদের “কার্তিকের থাকা” কাঁধে করে স্বল্পপরিসর রাস্তায় ছুটত। কোন ‘বাবু’র থাকা আগে যেতে পারে সেটার জন্য দৈহিক শক্তি প্রয়োজন পড়ত।এইসব বেহারাদের জন্য পচুই,চোলাই সহ কান্ট্রি স্পিরিট বিশেষভাব্র বরাদ্দ থাকত। স্বাধীনতার পর বঙ্কিম বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক ব্যবসায়ী হ্যাজাক,ডে-লাইট এর সঙ্গে ঝাড়বাতি সরবরাহ করতেন। এই সব শিল্পের সঙ্গে জড়িত পেশাদারী মানুষগুলো কার্তিক লড়াইয়ে বাড়তি কিছু আয় করত। ব্যবসায় নতুনত্ব আনতে ব্যবসায়ীরা ফি-বছর কার্তিক পুজোর জন্য নতুন নতুন উপকরণ সহ সাজ সরঞ্জাম আমদানি করত। কার্তিকে লক্ষী লাভ করলেও এদের উৎসবের প্রতি অপরিসীম মমত্ববোধ ছিল ।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: উৎসবের সময় দর্শনার্থীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে সামঞ্জস্য করার জন্য, সরকারী এবং বেসরকারী খাতগুলি প্রায়ই অবকাঠামোর উন্নতিতে বিনিয়োগ করে, যেমন রাস্তা, পাবলিক সুবিধা এবং পরিবহন ব্যবস্থা, যা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলকে উপকৃত করতে পারে।কাটোয়ার কার্তিক লড়াইয়ে কখনও বর্ধমান রাজার কোনরকম আনুকূল্য জোটেনি। তবে ব্রিটিশ শাসকদের অযাচিত সাহায্য মাঝে মাঝে উৎসবের মেজাজে কষাঘাত হানিয়েছিল। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে জল কমে যাওয়ায় নৌপরিবহণ বন্ধ হয়েছিল। নৌপরিবহন বন্ধ হয়ে পড়ায় সেবছর কার্তিক উৎসবে তেমন জাঁকজমক হয়নি। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে রেলপথ চালুর পরও রাণীগঞ্জ এলাকা থেকে ছোট নৌকা করে কয়লা কাটোয়ার স্টিমারঘাট লাগোয়া “ধোবা কোম্পানি”র গোডাউনে জমা হত। সেখান থেকে স্টিমার যোগে কলকাতা বন্দরে সরবরাহ করা হত। জেলা কালেক্টরের নির্দেশে বাড়তি বাণিজ্য কর চাপানোর ফলে ব্যবসায়ীরা কয়লা, মশলা, পাট সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। তৎকালীন কাটোয়ার মহকুমা শাসক তারকচন্দ্র রায়ের মীমাংসায় নৌপরিবহণ চালু হলেও কার্তিক পুজোর বহর কমেছিল বলে জানা যায়। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়কালে কার্তিক লড়াইয়ে ব্যাহত হয়েছিল। জেলা কালেক্টরেটের নির্দেশে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ডেভিড হিউজ রাত নটার মধ্যে শোভাযাত্রা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেবছর শহরে দর্শনার্থী কম এসেছিল। ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল। একই সমস্যা হিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমিয় ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে জেলা প্রশাসনের আরোপিত বিধিনিষেধের জেরে উৎসব বন্ধের উপক্রম হয়েছিল। যদিও ব্যবসায়িক ক্ষতি তেমন হয়নি বলে জানা যায়।
সাংস্কৃতিক রপ্তানি: কিছু উৎসব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং একটি দেশ বা অঞ্চলের সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি বিদেশী আগ্রহকে আকৃষ্ট করতে পারে এবং ঐতিহ্যগত শিল্প, সঙ্গীত এবং রন্ধনপ্রণালীর মতো সাংস্কৃতিক রপ্তানি বাড়াতে পারে, যা দেশের রপ্তানি আয়ে অবদান রাখতে পারে।কাটোয়ার কার্তিক লড়াই বাংলার উৎসবের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য পরিচিতি না পেলেও ব্যবসায়ী মহলে কাটোয়ার কার্তিক লড়াই ছাপ ফেলেছিল।
কাটোয়া বাণিজ্য শহর হিসেবে পূর্ব ভারতের ব্যবসায়ী মহলে বিশেষভাবে পরিচিতি ছিল।নদীতীরবর্তী কাটোয়া শহরে আধুনিক বন্দর ছিল। দুটো নদীর মিলনস্থল হওয়ায় নৌযান চলাচলের বহর ছিল বেশি। অজয় নদের উপর দিয়ে নৌযান মারফত কাটোয়া থেকে বীরভূম জেলা হয়ে বিহারের মুঙ্গের পর্যন্ত পণ্য সরবরাহ করা হত৷ অপরদিকে ভাগীরথী নদীর উপর দিয়ে আধুনিক নৌযান বা স্টিমার মারফত কাটোয়ার সঙ্গে হলদিয়া বা কলকাতার বন্দরের পণ্য সরবরাহ করা হত। কাটোয়ার বন্দরে আমদানি – রপ্তানি করা হত উন্নত বস্ত্র,লবণ, চাল,মশলা নারকেল, ঘি,চিনি, গুড়, কয়লা, কেরসিন,ময়দা এবং মনোহারি দ্রব্য সামগ্রী। নবাবি শাসনের কাটোয়া ছিল বণিকদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাণিজ্য কেন্দ্র। খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতক থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত কাটোয়ার বাণিজ্য কেন্দ্রকে ঘিরে অনেক ব্যবসায়ী বিত্তশালী হয়ে উঠেছিল। কাটোয়ায় সেই সময় বিশেষ শ্রেষ্ঠী সমাজের পত্তন হয়েছিল। কাটোয়ার বন্দর দিয়ে সেই সময় লবণ, গুড়, তসর, বস্ত্র,কয়লা, কেরসিন কাঁসার বাসন,চুন সবই রপ্তানি করা হত। নতুন বণিক সমাজের পত্তন হল। কাটোয়ার বিভিন্ন গ্রাম থেকে বা পার্শ্ববর্তী বীরভূম বা বর্ধমান, নদীয়া থেকে বিত্তশালীরা কাটোয়ায় বাণিজ্য করতে এসে কাটোয়াতে থিতু হয়ে গেলেন। ইংরেজ শাসনকালে কাটোয়ার ভাগীরথী তীরবর্তী বন্দর এলাকায় চুনারি পাড়া গড়ে উঠেছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায় কাটোয়ার “স্টিমার ঘাট” সংলগ্ন এলাকায় বাণিজ্যের সঙ্গে বারবণিতাদের পল্লি গড়ে উঠেছিল। যদিও কার্তিক পুজোর সঙ্গে বারবণিতাদের জড়িয়ে থাকার ইতিহাস নিয়ে মতান্তর আছে। কাটোয়া বন্দর বাণিজ্যে শ্রীবৃদ্ধি ঘটালে মনোরঞ্জনের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে শুরু হল । সেই সময় অর্থের বিনিময়ে কিছু শিকড়চ্যুত মহিলারা বারবণিতা পেশায় নাম লিখিয়েছিল। কাটোয়া বন্দরে আসা একশ্রেনীর বহিরাগত বণিকদের মনোরঞ্জন করতে বারবণিতারা এগিয়ে এসেছিল। কাটোয়া বন্দর এলাকায় ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ সাহায্যে বারবণিতারা নিজেদের আস্তানা গড়ে তুলেছিল।গবেষকদের দাবি বারবণিতাদের কেউ কেউ সন্তান কামনায় নিজেদের বাড়িতে কার্তিক আরাধনা শুরু করেছিল। বছরের পর বছর ধরে কাটোয়ার নদীতীরবর্তী কাটোয়ার চুনারি পাড়ায় অন্যান্য পাড়ার মতই বাড়িতে বাড়িতে কার্তিক পুজো হত। এছাড়াও শহরের ভিতরে আচার্য পাড়া, বৈষ্ণবপাড়া, টোলপাড়ার গৃহস্থের বাড়িতে শিশু কার্তিকের পুজো করার ইতিহাস আমরা আগেই জেনেছি। ব্রিটিশ শাসনকালে আনুমানিক ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কাটোয়ার বণিকদের প্রত্যক্ষ আর্থিক মদতে বাড়ির কার্তিক পুজো বাড়ির বাইরে পুজো পেতে শুরু করেছিল বলে জানা যায়। স্বাধীনতা বিপ্লবের ঢেউ কাটোয়া শহর স্পর্শ করেছে। অশান্ত কাটোয়ার বন্দর এলাকায় ব্রিটিশ পুলিশের পাহারা তটস্থ। বণিকরা নদীতীরবর্তী বন্দর এলাকায় উৎসবকে ঘিরে নিছক বিনোদনের জন্যই কার্তিক পুজোয় অর্থ সাহায্য করেছিলেন। কার্যত বণিকদের অর্থ সাহায্যে বারবণিতাদের পরোক্ষ চাহিদায় কার্তিককে ঘরের বাইরে পুজো করা শুরু করেছিল। শুরুর দিকে মাত্র পাঁচটি কার্তিক পুজোর সন্ধান পাওয়া যায়। স্টিমারঘাট অর্থাৎ চুনারপটি, তাঁতিপাড়া, পসারিপটি ও লবনগোলা ঘাটে বণিকদের আর্থিক সাহায্যে শ্রমিকদের আনন্দদানে ‘থাকা’ করে পুজো করা হয়। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে কাটোয়ার তাঁতিপাড়ার প্রতিষ্ঠিত বস্ত্র ব্যবসায়ী তারাপদ খাঁয়ের প্রত্যক্ষ আর্থিক সাহায্যে ‘সাতভাই’ কার্তিকের পুজো পত্তন হয়েছিল।শোনা যায় খাঁ পরিবারের কোন সন্তানহীন বধূর পাওয়া স্বপ্নাদেশে কার্তিক পুজো পত্তন হয়েছিল। সেই সময় এলাকার প্রতিভা দাঁ নামে এক মহিলা সাতভাইয়ের কার্তিকের দেয়াসিন ছিলেন। সন্তানহীন মায়েরা সাতভাই কার্তিকের কাছে মানদ করতেন এমন জানা যায়। সমসাময়িক সময়ে চুনারিপট্টি এলাকার বারবণিতারা কাটোয়ার স্টিমার ঘাট এলাকায় ন্যাংটা কার্তিকের পুজো পত্তন করেছিল।
কাটোয়া স্টিমার ঘাট সংলগ্ন এলাকায় চুনারিরা থাকত।চুন উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের চুনারি বলা হত।

শ্রমিকদের জীবিকা ছিল ঘটিং জড়ো করে ভাটিতে পুড়িয়ে ‘চুন’ তৈরি করা। কাটোয়ার চুন ছিল খুবই উন্নতমানের। সেই সময় কংক্রিটের গাঁথনি মানেই ছিল চুন-সুরকির ইমারত। কাটোয়ার উৎপাদিত চুন নৌযানে করে কলকাতা সহ বিভিন্ন শহরে সরবরাহ করা হত। চুনারিদের বসবাসের জন্য কাটোয়া দত্তরা স্টিমারঘাট সংলগ্ন এলাকায় বস্ত্র ব্যবসায়ী ঈশ্বর দত্তদের দেওয়া জমিতে পত্তন হয়েছিল এই চুনারি পাড়া। কয়েকদশক পরে এই চুনারিপাড়াতে বারবণিতারা দলবদ্ধ ভাবে বসবাস করত বলে জানা যায়। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বণিকদের অর্থ সাহায্যে বণিকদের মোকামের কর্মী, নৌযানের শ্রমিক, নাবিক থেকে বন্দরের শ্রমিকদের আনন্দ দানের জন্য ‘ন্যাংটা কার্তিকের’ পুজোর পত্তন হয়। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি কাটোয়ায় পাঁচটি কার্তিকের বড় পুজোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়।রীতিমতো পুতুল দিয়ে পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে থাকা সাজিয়ে পুজো হত। পুজোকে ঘিরে এলাকায় রাত অবধি জলসা বসত। যেমন পসারিপটি,কলাইপটি, সোনাপটি, খড়ের বাজার, তাঁতিপাড়ায় বিগ বাজেটের কার্তিক পুজো হত। পুরনো তথ্য অনুসারে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে কাটোয়ায় ১৬ টি কার্তিকের পুজো হয়েছিল। অষ্টাদশ শতকে কাটোয়ার শ্রেষ্ঠী সমাজ পরিবারের কৌলিন্য প্রদর্শনে নিজেদের বাড়িতে দুর্গাপুজো প্রতিষ্ঠা করত। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে উনবিংশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের শুরুর দিকে কাটোয়ার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা ‘বাবু তকমা’ বহাল রাখতে নিজেদের ব্যবসায়ী এলাকায় কার্তিক পুজো করত। যতদিন যাচ্ছে কাটোয়ায় কার্তিকের আরাধনাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করল। বণিক থেকে ব্যবসায়ী সকলেই কার্তিক পুজো নিয়ে আরও সক্রিয় হয়ে উঠল।বাংলার ‘বাবু’ সংস্কৃতি কাটোয়ায় প্রচলন হল। বাবুদের মোকামগুলো সব এক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেহারা নিয়েছিল। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী থেকে উঠতি ব্যবসায়ীরা বাবু নামে পরিচিতি পেতে শুরু করেছিল। কাটোয়ার লবণ ব্যবসায়ী, বস্ত্র ব্যবসায়ী, ঘি ব্যবসায়ী, চিনি,কয়লা, মনোহারি সামগ্রীর ব্যবসায়ী, সোনা ব্যবসায়ীরা ভুষিমাল ও পাটের মজুতদার, গুড়ের ব্যবসায়ী থেকে ব্রিটিশ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা শহরের কার্তিক আরাধনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ল। আনুমানিক ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কাটোয়ার কার্তিকের শোভাযাত্রাকে “লড়াই” আখ্যা দেওয়া হয় বলে জানা যাচ্ছে। লড়াই দেখতে আশপাশের উৎসাহী মানুষ ভিড় করত।বিসর্জনের শোভাযাত্রা কীভাবে লড়াই নাম পেল তার সুন্দর ব্যাখ্যা আছে। সাবেক কাটোয়া নগরীর উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে বণিকদের মোকাম বা বাড়ি সবই ছিল নদীতীরবর্তী এলাকায়।সেজন্য কার্তিকের শোভাযাত্রার রুট ছিল কাটোয়ার নিচুবাজার চৌরাস্তা থেকে বারোয়ারিতলা অবধি।কার্তিকের বড় বড় ‘থাকা’ নিয়ে সাঙ কাঁধে বেহারার দল প্রায় চারশ মিটার পথ অতিক্রম করতে ঘন্টা পার করে দিত। সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের কাছে স্বল্প পরিসর পথে কোন বাবুর ঠাকুর আগে যাবে এই নিয়ে হত ‘লড়াই’। সাঙ কাঁধে বেহারার দল গায়ের জোরে “কার্তিকের থাকা” কে এগিয়ে নিয়ে যেত। শারীরিক সক্ষমতায় দেখিয়ে সব বাধা অতিক্রম করে যে “বাবুর” ঠাকুর আগে পৌঁছে যেত সেই বাবু ব্যবসায়ী মহলে বাড়তি সম্মান পেত। বাবুদের মধ্যে বাড়তি সম্মান বা সমীহ আদায়ের জন্যই কার্তিকের শোভাযাত্রায় এই শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক লড়াই অনুমোদিত ছিল। সেকারণেই ফিবছর পুজো উদ্যোক্তারা বলশালী বেহারার দল ভাড়া করত। খুব তাড়াতাড়ি কাটোয়ার কার্তিক লড়াই জনপ্রিয় হয়ে উঠল। বছর কয়েকের মধ্যেই কাটোয়ার কার্তিক পুজো “কার্তিক লড়াই” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।কিন্তু দুঃখ বা পরিতাপের বিষয় তৎকালীন কাটোয়া থেকে প্রকাশিত কোন সংবাদপত্রে কাটোয়ার কার্তিক লড়াই নিয়ে কোন খবর ছাপা হয়নি। মন্মথনাথ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বহুল প্রচারিত ‘প্রসূন ‘ পত্রিকা বা বসন্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদিত ‘অঞ্জলি’ বা নিত্যানন্দ ঠাকুরের সর্বোদয় পত্রিকার কোথাও “কার্তিক লড়াই” নিয়ে তেমন নজরকাড়া প্রতিবেদন চোখে পড়েনা। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ নভেম্বর কাটোয়ার নিজস্ব উৎসব কার্তিক লড়াই নিয়ে “অঞ্জলি” পত্রিকায় ভিতরের পাতায় কয়েক লাইনের খবর ছাপা হয়েছিল। প্রাক স্বাধীনতার সময়কাল থেকে কাটোয়ায় ‘কার্তিক লড়াই’এর খ্যাতির প্রচার শুরু হয়েছিল। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে কাটোয়ায় ২৩ টি ছোট-বড় কার্তিক পুজোর সন্ধান পাওয়া গেলেও ‘লড়াই’-এ অংশ নিয়েছিল ১৮ টি পুজো কমিটি। যার ফলে বিকাল থেকে মধ্যরাত অবধি শোভাযাত্রা ভিড় লেগে থাকত। বেহারার দল কার্তিকের থাকা নামিয়ে ঘন্টা খানেক ধরে বিশ্রাম নিত বলে প্রবীনরা জানান। শোভাযাত্রা বা ‘লড়াই’ দেখতে আশপাশের গ্রাম- গঞ্জ থেকে শহরে বিকাল থেকেই প্রচুর মহিলা-পুরুষ আসত।যানবাহনের সমস্যা থাকায় অনেকেই বাড়ি ফিরতে পারতেন না। ওই সব দর্শনার্থীরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শহরের বিভিন্ন বাবুর বাড়ির বারান্দায় নির্দ্বিধায় রাত যাপন করতেন। কোনদিন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কার্তিকের শোভাযাত্রা বা ‘লড়াই’কে কেন্দ্র করে শহরে দর্শনার্থী থেকে বেহারার দল মিলে নানান ধরনের মানুষের আগমন হলেও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার নজির নেই।
অত্যাধিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির রাশ টানতে জেলার অন্যান্য শহরের হাটে বা গঞ্জে বিশেষ নজরদারির জন্য অভিযান চললেও ১৯৪৩-৪৪ খ্রিস্টাব্দে কার্তিক উৎসবের জন্য কাটোয়ায় কোন সরকারি অভিযান করা হয়নি। ১৯১৫-১৮ খ্রিস্টাব্দের পর ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ আর্থিক মদতে কাটোয়ায় কার্তিক পুজো হয়েছিল। প্রাক স্বাধীনতার সময়ে কাটোয়ার কার্তিক পুজোকে ঘিরে জাঁক-জমক বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে কলাইপট্টি ও পসারি পট্টির উদ্যোগে কাটোয়ার টাউনহলে কার্তিক পুজোর দুদিন ধরে চলত যাত্রাপালা। স্থানীয় নাট্যমোদী যাত্রাপ্রেমীরা অভিনয় করতেন।মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থেকে কনসার্ট ভাড়া করা হলেও ড্রেস ভাড়া নেওয়া হত কাটোয়ার ঠাকুরপুকুর পাড়ের জননী ড্রেস কোম্পানি থেকে। দর্শনার্থীরা রাতভর যাত্রা দেখে সকালে বাড়ি যেতেন। পসারিপটি,কলাইপটি, চাউলপটি, খড়ের বাজার,শাঁখারি পটি, চুনারিপাড়া, হাঁড়িহাট,তুলা পটি মুড়কিহাট, কাটোয়ার হাট,( ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের পর ‘বাজারের পুজো’ নামে পরিচিতি পায়) ভেটেরাপাড়া এলাকায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক সাহায্যে কার্তিকের থাকা করে বেশ ধুমধাম করে পুজো শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার পর কাটোয়ার আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে বারোয়ারি কার্তিকের আরাধনাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।রেলপথ চালুর পরও ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ‘হোর মিলার এন্ড কোম্পানি’ কাটোয়া স্টিমার ঘাট থেকে কলকাতা বন্দর পর্যন্ত স্টিমার পরিবহণ চালু রেখেছিল। স্টিমারঘাট এলাকায় নাবিকরা একটা পুজো করত। পরে স্টিমারঘাট লাগোয়া জমিতে মোকাম ছিল ব্যবসায়ী বানোয়ারিলাল পাঁজার। বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বানোয়ারিলালের একক অর্থ সাহায্যে কাটোয়ার স্টিমারঘাট এলাকায় কার্তিক পুজোর পত্তন হয়েছিল। কলাইপটিতে বাবুলাল বাজোরিয়ার অর্থ সাহায্যে কার্তিক পুজো শুরু হয়েছিল। তিলিপাড়ার বাসিন্দা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রাধিকারঞ্জন দের উদ্যোগ চাউলপটিতে কার্তিক পুজো শুরু হয়েছিল। কাটোয়ায় উনবিংশ শতকের শুরুর দশক থেকে বিংশ শতকের শুরুর দিক পর্যন্ত কাটোয়ার বণিক সমাজে চন্দ্র, মহুরি, দে,দত্ত,সাহা,দাস,গুঁই,পোদ্দার ও পাঁজা পদবিদারীদের বেশি প্রাধান্য ছিল। কাটোয়ার বন্দরে আমদানি – রপ্তানি করা হত বস্ত্র,লবণ, চাল, নারকেল, ঘি,চিনি, গুড়, কয়লা, কেরসিন,ময়দা এবং মনোহারি দ্রব্য সামগ্রী। এই সব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে কাটোয়ায় প্রায় ৩৩ টি কার্তিক পুজোর অস্তিত্বের কথা জানতে পারা যায়। ১৯৬৪-৬৫ নাগাদ কাটোয়ায় এলাকা ভিত্তিক ক্লাবগুলো কার্তিকের আরাধনায় সামিল হয়।ঝঙ্কার,নবরাগ, কিশলয়, জনকল্যান, সমাপ্তি, রেনেসাঁস, জয়শ্রী, দেশবন্ধু, ইয়াংকার, ইউনিক, সমাপ্তি, প্রতিবাদ এরকম বেশ কিছু ক্লাব কয়েক দশক ধরে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কার্তিকের পুজো করে আসছে। কার্তিকের শোভাযাত্রার রুটের বৃদ্ধি ঘটল। পসারিপটি মোর থেকে বারোয়ারি তলা পুরনো শোভাযাত্রার রুট বেড়ে হল পসারিপটি মোড় থেকে নিচুবাজার, সতীশ সাহার ঘাট, কলাইপটি হয়ে থানার সামনে দিয়ে ঠাকুরপুকুর পাড় থেকে চাউলপটি মধ্যে দিয়ে পসারিপটি হয়ে বারোয়ারিতলা। প্রায় দুকিমি পথ বড় বড় কার্তিক ঠাকুরের থাকা নিয়ে বেহারারদল ‘সাঙ’ নিয়ে ছুটত। আশপাশ জেলা থেকে দর্শনার্থীরা কাটোয়ার কার্তিক লড়াই দেখতে ভিড় করত।কাটোয়া পুজো উদ্যোক্তা থেকে সাধারণ মানুষের চাহিদায় শোভাযাত্রার রুটে সামান্য পরিবর্ধন করা হল। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ পসারিপটি থেকে খড়ের বাজার, কারবালাতলা হয়ে বারোয়ারিতলা পর্যন্ত পরিবর্ধন করা হয়। শতাব্দী প্রাচীন কিছু পুরনো পুজো বন্ধ হয়ে যায়। আবার বেশ কিছু নতুন পুজোর পত্তন হয়।১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে কাটোয়া শহর আড়ে-বহরে বাড়তে থাকল সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কার্তিক পুজোর সংখ্যা বাড়তে শুরু করল। কাটোয়ার মানুষের একান্ত নিজস্ব উৎসব হিসেবে কার্তিক জায়গা করে নিল। ব্যবসায়ীরা ছাড়াও স্থানীয় বাসিন্দাদের চাঁদায় কার্তিকের পুজো হতে শুরু হল। কার্তিকের মূর্তিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা শুরু হল। মাটির পুতুল দিয়ে পৌরাণিক পালার উপর আধারিত কাহিনিকে ঘিরে তৈরি “থাকা”র পরিবর্তন ঘটল। কার্তিকের নানান আঙ্গিকের মূর্তি, সুউচ্চ নান্দনিক প্যাণ্ডেল, আলোক সজ্জায় কাটোয়া শহর অপরূপ চেহারায় সেজে ওঠে। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের পর তিন দশকে কাটোয়ার কার্তিকের শোভাযাত্রার রুটের পরিবর্ধন হয়েছে।স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে কাটোয়ার কার্তিকের শোভাযাত্রার রুট আমুল পরিবির্তন করা হয়। প্রায় চার কিমি পথে কার্তিক শোভাযাত্রা ঘোরে। এখন প্রশাসনের অনুমোদিত পুজোর সংখ্যা একশ ছুঁইছুঁই। কাটোয়ার ঐতিহ্যবাহী কার্তিক লড়াই মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করেছে। আশপাশের জেলা থেকে আসা প্রায় লাখ খানেক দর্শনার্থীকে সামলাতে হাজারের উপর পুলিশ মোতায়েন করা হয়।এখন শহরে সরকারি বেসরকারি লজ,হোটেল হয়েছে। রাত যাপনের খুব একটা অসুবিধা হয় না। যানবাহনের বহর বেড়েছে। মধ্যরাত পর্যন্ত ট্রেন থাকে বলে দর্শনার্থীদের এখন আর কারও বাড়ির বারান্দায় রাত কাটাতে হয়না।
প্রায় দেড়শ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের হাতে শুরু হওয়া উৎসব কালের বিবর্তনে ক্লাব সংস্কৃতির গ্রাসে পড়ে তার শ্রীবৃদ্ধি ঘটল। এখন কাটোয়ায় কার্তিকের প্যাণ্ডেলে পিছনে খরচ হয় কোটি টাকার উপর। আলোক সজ্জা, ডগর,তাসা ঢোল সহ আধুনিক বাজনাতে খরচ হয় পঞ্চাশ লাখ টাকা। টাকার পরিমাণ শুনলে বলা যেতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কাটোয়ার কার্তিক লড়াই এগিয়ে যাচ্ছে।
রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতা বা সরকারি বদান্যতা ব্যাতিত একটি উৎসবকে কাটোয়ার মানুষের কাছে ‘নিজস্ব উৎসব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কাটোয়ার শ্রেষ্ঠী সমাজ সফল হয়েছিল। আমরা প্রাচীনকাল থেকে শুনে বা দেখে আসছি দেশের বা অঞ্চলের যেকোন উৎসব সর্বজনীন রূপে পরিনত হতে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশাসনের কৃপাদৃষ্টির প্রয়োজনের কথা। কাটোয়ার “কার্তিক লড়াই”এর কপালে কিন্তু রাজঅনুগ্রহ বা প্রশাসনিক সাহায্য কোনটাই জোটেনি। তবুও এলাকার নিজের উৎসব হিসেবে কার্তিক লড়াই কাটোয়া এলাকায় পরিচিতি লাভ করেছে।শুধুমাত্র রাজঅনুগ্রহ বা সরকারি ছিঁটেফোঁটা দাক্ষিণ্য না পাওয়ার কারণে কাটোয়ার কার্তিক উৎসব আড়ে-বহরে বৃদ্ধি পেয়ে মানুষের মন জয় করেও সর্বজনীন লোকজ উৎসবের স্বীকৃতি জোটাতে পারেনি।এটা কাটোয়ার সাংস্কৃতিক প্রবণ মানুষ ও বিদ্বজ্জনদের ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু নয়। ব্যবসায়ীদের আন্তর ইচ্ছায় প্রত্যক্ষ আর্থিক উদ্যোগে কাটোয়ার কার্তিক পুজোকে কার্তিক লড়াইয়ে পরিনত করলেও লোকউৎসব পরিচিতি করতে না পারার খেদ হয়ত থেকে গিয়েছে। কাটোয়ার শ্রেষ্ঠী সমাজের পত্তন করা কার্তিক পুজো একসময় কাটোয়ার গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। উৎসবে গ্রামীণ অর্থনৈতিকের প্রভাবের যে পথ তৈরি করে দিয়েছিল আজও সেই পথে স্থানীয় ক্লাব বা সংগঠনগুলি কার্তিক পুজোর প্রাচীন ধারা বহন করে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে কাটোয়ার কার্তিক পুজো আর ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমিত নেই বললেই চলে।বিংশ শতকের সাতের দশক থেকে কাটোয়ার কার্তিক পুজো পাড়ার ক্লাবের দখলে চলে যেতে শুরু করে। অর্থনৈতিকভাবে বিবর্তন ঘটলেও,কার্তিক থাকা প্রায় লুপ্ত হল, ‘থিম’ পুজো শুরু হল।কার্তিক পুজোর সীমা বেড়ে শহরতলি ছাড়িয়ে পঞ্চায়েত এলাকায় পৌঁচেছে। আধুনিক মোড়কে শহরে পুজো কমিটি গুলো সাজতে শুরু করল সুদৃশ্য নান্দনিক প্যাণ্ডেলে,আধুনিক আলোর রোশনাইয়ে ভেসে যায় কাটোয়া শহরের পথঘাট। শহর যে আর্থিক ভাবে প্রভূত উন্নতি লাভ করেছে সেটা কার্তিক আরাধনার আঙ্গিকে কার্যত প্রমাণ হয়।চৈতন্যের দীক্ষাভূমে দেবসেনাপতি কার্তিককে অতিক্রম করে দর্শনার্থীদের অবাক দৃষ্টি এখন আটকে যায় টুইন টাওয়ারের শিখরে। শহরের কৃত্রিম উৎসবের মায়াময় আলো নিজে থেকে খেলা করে জানান দেয় গ্রামীণ অর্থনীতির সূচক ছুঁতে চাওয়ার গল্পকথা। মন নেচে উঠলেও কাটোয়াবাসীর কাছে দেশের লোক উৎসবের স্বীকৃতির তকমা পাওয়া কিন্তু এখনও অধরায় থেকে যায়। এবড় বেদনার।






















