সৈকত ভট্টাচার্য্য, কাটোয়া:- কার্তিক মাস মানেই গ্রামবাংলার আকাশে আলোর উৎসবের সুরভি। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ির ছাদে একে একে জ্বলে উঠত মাটির প্রদীপ, তেলের গন্ধে ভরে উঠত চারপাশ, আর দূর থেকে দেখা যেত এক অনিন্দ্য দৃশ্য অগণিত প্রদীপে আলো ছড়ানো যেন নক্ষত্রভরা আকাশ নেমে এসেছে মাটিতে। ছোট-বড় সকলেরই উৎসাহ ছিল এই ‘আকাশ প্রদীপ’ দেওয়ার রীতিতে। কোথাও প্রদীপের পাশে টাঙানো থাকত কাগজে রঙিন মানুষের ছবি, কোথাও আবার দেখা যেত ছোট ফানুস আকাশে ভাসতে। কিন্তু আজ, আধুনিকতার দাপটে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গিয়েছে। ফানুস, প্রদীপ, মাটির দিয়া সব কিছুকেই যেন গ্রাস করেছে ‘চায়না লাইট’ নামের বৈদ্যুতিক আলো। তবুও ঐতিহ্যের আলো নিভে যায়নি পুরোপুরি, শুধু বদলে গেছে তার রূপ। আর মাত্র একদিনের অপেক্ষা, তারপরেই কালীপুজো আলোর উৎসব দীপাবলি। ইতিমধ্যেই কাটোয়া শহরজুড়ে শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ। সন্ধ্যা নামতেই হিমেল হাওয়ার সঙ্গে রংবেরঙের আলোর ঝলকানিতে ভরে উঠছে শহরের অলিগলি। রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ভিড়, আর ব্যবসায়ীদের মুখে ফুটে উঠছে বিক্রির আনন্দ। কাটোয়া স্টেশন বাজারের ইলেকট্রিক দোকানগুলিতে এখন উৎসবের মেলা। রংবেরঙের ঝুলন্ত লাইট, মালা, ফেয়ারি লাইট, ল্যান্টার্ন, ও এলইডি ফ্রেমে সাজানো দোকানগুলো যেন চোখ ফেরানো দায়। দূর থেকেও মনে হয়, রঙের বন্যা বইছে আলোয়।

ইলেকট্রিক পণ্য বিক্রেতা শরাফত শেখ বলেন,আগে দীপাবলি মানেই প্রদীপ, তেলের গন্ধ, মাটির দিয়া এই ছিল আমাদের সাজানোর ধরণ। কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে। ইলেকট্রিক আলো সেই জায়গা নিয়েছে। মানুষ এখন চায় সহজ, নিরাপদ আর দীর্ঘস্থায়ী আলোর। এক ক্রেতা, রনজিত মাঝি জানালেন,ছোটবেলায় আমরা বাঁশের মাথায় নারকেলের খোলের মধ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে কালীঠাকুর দেখতে যেতাম। সেই গন্ধ, সেই আলো এখনো মন ভরে যায় মনে পড়লে। কিন্তু আজকের দিনে বাচ্চারা ইলেকট্রিক লাইটেই আনন্দ খুঁজে পায়। সময় বদলেছে, আমরা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি।

শহরের প্রতিটি ইলেকট্রনিক্স দোকানে এখন ক্রেতার ঢল। কেউ কিনছেন ঝুলন্ত মালা লাইট, কেউবা বাড়ির ছাদের চারপাশ ঘিরে সাজাচ্ছেন নীয়ন লাইটে। বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, এবারের বিক্রিবাটা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। আধুনিক আলোর ঝলকানিতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হয়তো কিছুটা আড়াল হয়ে যাচ্ছে, তবু সেই ঐতিহ্যের ছায়া এখনো রয়ে গেছে স্মৃতিতে। হয়তো আজ মাটির দিয়া জ্বলে না আগের মতো, কিন্তু মানুষের মনে সেই আলোর উৎসব আজও জ্বলজ্বল করছে অমলিন আলো হয়ে।























